কালের কন্ঠ
ঢাকা, সোমবার, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৭, ১ রজব ১৪৩১, ১৪ জুন ২০১০
শাহীন আহমেদ
এবার পাহাড়ে থইথই জোছনা দেখা যাবে। ঘরের চালে, জানালায়, বারান্দায় থোকা থোকা দুধ-সাদা জোছনা এসে ভিড় করবে। জোছনাদলের নৃত্য দেখতে আমরা কোমর বেঁধে লেগে গেলাম। ২৭ মে ছিল বুদ্ধ পূর্ণিমা। পরের দুই দিনও ছুটি। রাঙামাটির বিলাইছড়ির উজানে ফারুয়া ছেড়ে পানছড়ি পর্যন্ত যাব এবার। দল গিয়ে ঠেকল ১৩ জনে। ২৬ মে রাতে ঢাকার শ্যামলী বাসে করে রওনা দিই। কাপ্তাই পেঁৗছাই ভোরে। বৃষ্টিস্নাত স্নিগ্ধ লেক দেখে মন ভরে যায়। বাস কাউন্টার-লাগোয়া টয়লেটে হাত-মুখ ধুয়ে ঢুকে পড়ি পাশের একটি রেস্টুরেন্টে। নাশতা খেয়ে নৌঘাটে যাই। নৌকা সমিতির বুলবুল ভাইয়ের সহযোগিতায় একটি ভালো ট্রলার পাওয়া সহজ হয়। ট্রলারে ওঠার আগে দরকারি কেনাকাটা করে নেন জিলানী ভাই।
কচুরিপানা ঠেলে ও পাহাড়ি বাঁশের সঙ্গে জোর ধাক্কাধাক্কি করে এগিয়ে চলে ট্রলার। নাসির মাঝি একাই এক শ। কিছুটা পথ গিয়ে বাঁক নিয়ে ঢুকি ছোট্ট একটি খালে। নাম রাইলার খাল। পাহাড়সারির মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে। বৃষ্টি-ধোয়া পাহাড়-প্রকৃতি দারুণ সতেজ। সবাই ভিড় করলাম ট্রলারের ছাদে। দলে এবার তবলা, করতালের সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছে গিটার। গানের দল গলা ছেড়ে দিল। ট্রলারের আওয়াজ ছাপিয়ে সে গান নদী ছুঁয়ে চলে গেল পাহাড়ে। বিলাইছড়ি পেঁৗছার আগেই নোমানী ভাইয়ের টেলিটক ছাড়া অন্যগুলো কার্যক্রম গুটিয়ে নিল। গাইড বঙ্কিম তঞ্চঙ্গ্যাকে ফোন করতেই তিনি বললেন, ‘আসুন। আমি সকাল থেকেই আপনাদের অপেক্ষায় বসে আছি।’
বিলাইছড়ি বাজারে যখন নৌকা ভেড়ে, তখন দুপুর। টাটকা তেলাপিয়া দিয়ে ভাত খাই। খেয়ে ট্রলার ছোটাই আরো উজানে। সবুজ পাহাড় থেকে এখন গরম আসছে। রেগে গেছে সূর্য। আমরা ট্রলারের ভেতরে ঢুকে পড়ি। রিপন, শাহরিয়ার, সাগর ভাতঘুম দেয়। বিকেলে আসে ঠাণ্ডা বাতাস। বৃষ্টিও আসবে বোধ করি। ফারুয়া এখনো অনেক দূর। রাত হওয়ার আগেই পেঁৗছানো দরকার। চেষ্টা চলল, কিন্তু সুবিধা হলো না। সন্ধ্যা নেমে আসে। অন্ধকার ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আমরা এগিয়ে যাই। আরো দূর গিয়ে মাঝিকে শুধাই, ও ভাই, রাত যে হয়ে এল! ফারুয়া কই? নাসির মাঝি যা উত্তর দেয়, তাতে ঠিক দিশা পাওয়া যায় না। এক জায়গায় এসে হঠাৎই থেমে যায় ট্রলার। খটকা লাগে। টর্চ হাতে অনেক লোক দেখতে পাই। বঙ্কিমদা বললেন, খালে বৃষ্টির পানিতে অনেক মাছ এসেছে। জাল দিয়ে মাছ ধরছে এরা। নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে সবাই মেতেছে মাছ ধরার উৎসবে। বেশ লাগল।
ইতিমধ্যে আকাশে চাঁদ এসে হাজির। কাঁসার থালার মতো রুপালি চাঁদ। ধাবমান মেঘদলের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আবার আমাদের চলা শুরু হয়। ট্রলার থামাই ফারুয়া বাজার এসে। এখানে খাবার বলতে পাওয়া গেল ঠাণ্ডা ভাত, আলুভর্তা আর ডাল। চাইলে ডিম ভাজা হবে। দোকানি জানালেন, মাছ আছে। তবে রান্না হতে অনেক সময় লাগবে। আমরা বললাম, লাগুক। মাছই খাব। ডোবা তেলে ভেজে একটু পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করুন, ভাত বসান। দোকানি লেগে যান রান্নার কাজে। আমরা জমে যাই গালগল্পেগু। সঙ্গে চিনি কম দুধচা আর খাজা (গজা) খেতে থাকি। একপাক চক্কর দিতে বের হই। ‘এল’ সাইজের বাজার। বাজারের পুবে, ডানে ও পেছনে পাহাড়। একটি হিন্দু মন্দিরও আছে। ঘণ্টা পার হলে পেটপুরে খাই মাছ-ভাত। ট্রলারে ফেরার সময় দেখি আকাশ ভেঙে জোছনা নেমে আসছে। দোকানপাট, গাছপালা, খালের জল, কাপড়চোপড়, জুতো_সব জোছনা-ধোয়া সাদা। লড়াইয়ে জিতে চাঁদের কি হাসি! বাধ মানছে না। আমরাও রূপে বিভোর। সাধ্য কি তার বর্ণনা দেওয়া! গোল হয়ে বসি ট্রলারের ছাদে। জোছনায় ভিজে গান ধরি।
কখন যে ভোর হয় ঠাহর পাই না। বাজারে যাই, ঘোরাঘুরি করি, নাশতা খাই। এতক্ষণ যে মেঘদল উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল, তারা এবার দলবেঁধে নেমে আসে ফারুয়া বাজারে। টানা চার ঘণ্টা চলে বৃষ্টির নাচন। আমাদের অবাক করে দিয়ে পাহাড়ি ঢল নামে খালে। অল্প সময়েই খাল ভরে যায়। স্রোত বাড়ে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে আমরা খালের ওপারে যাই। এখানে বঙ্কিমদার বাড়ি ও দোকান। জায়গাটি খুব সুন্দর। পাহাড়ের পায়ে বাড়িঘর, অনেক খোলা জায়গা। ওপরে বৌদ্ধ মন্দির। বেলা বাড়তে থাকে। চলার সময় হয়ে আসে। পাহাড়ি ঢল নেমে গেলে খাল শুকিয়ে আসবে বলে আমাদের ট্রলার রেখে যাই ফারুয়া বাজারে। ছোট দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিই। খালের পানি তরঙ্গ তুলে নিচে ধেয়ে চলেছে। ফারুয়া বাজারের পর আর কোনো বাঙালি বসতি নেই। আমরা পানি উজিয়ে আস্তে আস্তে চলি।
এভাবে একসময় গোবাছড়ি, চেংড়াছড়ি হয়ে চলে যাই পানছড়ি। তখন বিকেল নেমেছে। ঝরনায় গোসল করি দলবেঁধে। তারপর একটা দোকানে গাছপাকা পাহাড়ি মিষ্টি কলা, বেলা বিস্কুট ও চা খাই। অন্ধকার নামার আগেই ফিরে আসি চেংড়াছড়ি পাড়ায়। কারবারির সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয়। এর মধ্যে বড় দুটি মোরগ নিয়ে আসে একজন। ২০০ টাকা কেজি দরে তার একটি কিনে নিই। কারবারি আমাদের জন্য একটি ঘর বরাদ্দ করেন। ঘরের নিচ দিয়ে বয়ে গেছে রাইফং খাল। ঘরের লোকজন গেছে জুমে। আমাদের আনন্দ আর ধরে না। আমাদের চিফ শেফ হোমায়েদ ইসহাক মুন মোরগ নিয়ে রান্না করতে যায়। ওয়াকিল ভাই গিটার বাজিয়ে গান ধরেন। গলা মেলান সামির ভাই_’সখি কুঞ্জ সাজাওগো আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে।’ অন্যদের সঙ্গে পাড়ার মেয়েরাও গান শুনতে এলে আমাদের উৎসাহ বাড়ে, গলা চাঙ্গে ওঠে। ‘ওয়ান মোর’ আশা করেছিলাম। আশা পূরণ হলো না, তবে রান্না শেষ হলো। আর দেরি করি না, পাত পেতে বসে পড়ি। রাতে টানা ঘুম দিয়ে খুব সকালে উঠি সবাই। যে ঝরনাকে কেন্দ্র করে এ পাড়া গড়ে উঠেছে, তা দেখতে বেরোই। ঝিরি ধরে এগোতে থাকি। এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে ঝিরি। মাঝেমধ্যে বড় বড় পাথর। মাঝে বসতিও আছে। চাকমা আছে, তবে বেশির ভাগই তঞ্চঙ্গ্যা। একসময় পেয়ে যাই চেংরাছড়ি ঝরনা। শীর্ণ জলধারা। ঝরনা ছাড়িয়ে এগিয়ে যাই পাথুরে দেয়াল ঘেঁষে। এবার অনেক পানি পাই। গোসল করি অনেকক্ষণ ধরে। শীতল জল বড় ভালো লাগে। পাড়ায় ফিরে নুডলস রান্না করে শাহরিয়ার। খুব করে খাই। মাঝিরা তাড়া দেয়_খালে পানি থাকবে না। জলদি ব্যাগ গোছাই। নৌকায় উঠি। খানিক যেতেই বৃষ্টি নামে। জলেরা নাচে। আমরা আবার মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকি জলের নাচন। আমাদের মাঝি জাল দিয়ে ধরে ফেলে বড় সাইজের এক কালিবাউস। আমরা ভাগ চাই, কিন্তু দেয় না। তার ধরা মৌসুমের প্রথম মাছ বলে সে একাই খাবে। বৃষ্টি থামে ফারুয়া বাজারে এসে। আমরা ট্রলারে গিয়ে উঠি। ট্রলার চলে, ফিরতে থাকি। ছুটি ফুরাল, নটে গাছটি মুড়ল।
কিভাবে যাবেন
আরামবাগ, ফকিরাপুল থেকে শ্যামলী, এস আলম, সৌদিয়াসহ আরো কিছু বাস কাপ্তাই যায়। ভাড়া ৩৩০ টাকা। ফারুয়া পর্যন্ত ট্রলার ভাড়া তিন দিন তিন হাজার টাকা। ফারুয়া থেকে ইঞ্জিন নৌকা প্রতিটি এক হাজার ৫০০ টাকা। কাপ্তাই থেকে খাবারের জিনিসপত্র প্রয়োজনমতো সঙ্গে নিতে পারেন। ফারুয়া বাজারেও অনেক কিছু পাবেন। প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে যাওয়া ভালো।










